এই প্রথম ময়মনসিংহে টেকসই খাদ্য নিরাপত্তায় ҅কৃষক অ্যাপস’ ডিজিটাল পদ্ধতিতে কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ

0
426

মোঃ রবিউল আউয়াল রবি, ময়মনসিংহ ব্যুরোঃ সরকারি গুদামে ধান, চাল ও গম কেনাকাটায় অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ডিজিটাল পদ্ধতিতে দেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য কেনাকাটা চালু করা হচ্ছে। ধান, চাল ও গম সংগ্রহ অভিযানে খাদ্য অধিদফতর চালু করেছে ডিজিটাল সেবা ‘কৃষক অ্যাপস’ । তালিকাভুক্ত যে কোনো কৃষক অ্যাপসটি ডাউনলোড করে নিতে পারে বা ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্রেও এ সেবা পাওয়া যাবে। অ্যাপসে প্রবেশ করে প্রথমে কৃষক নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর দিয়ে নাম নিবন্ধনের আবেদন করবেন এই অ্যাপসে প্রবেশ করে জমির পরিমাণ, ফসলের নাম ও কী পরিমাণ বিক্রি করতে চান তা জানাতে পারবেন। আবেদনগুলো লটারির মাধ্যমে চ‚ড়ান্ত করবে এ সংক্রান্ত উপজেলা কমিটি। কী পরিমাণ শস্য কেনা হবে তা মনোনীত কৃষককে এসএমএসের মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হবে। জমির পরিমাণের তুলনায় বেশি ধান বিক্রি করলে প্রতারণা হিসেবে গণ্য হবে। এ জন্য দুর্নীতির মামলার মুখোমুখি হতে হবে সংশ্লিষ্ট কৃষককে। এটি কার্যকর হলে সরকারি গুদামে খাদ্যশস্য দিতে মধ্যস্বত্বভোগী, রাজনৈতিক নেতা ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের পিছে পিছে ঘুরতে হবে না কৃষকদের। এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব খাদ্য মন্ত্রণালয় অনুমোদন হয়েছে,এতে করে কৃষকের কাছ থেকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ধান, গম এবং মিলারদের কাছ থেকে চাল কেনা হবে। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল এ সংক্রান্ত অ্যাপস তৈরি করেছে। প্রাথমিকভাবে আট বিভাগের ১৬টি উপজেলায় এটি শুরু হচ্ছে। পরে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে কার্যকর হবে। এতে করে ধান-চাল ও গম কেনাকাটায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে এবং কমে আসবে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। ‘কৃষক অ্যাপস’-এর মাধ্যমে খাদ্যশস্য কেনাকাটায় একটা নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। এটি কৃষকের ন্যায্যম‚ল্য পাওয়া এবং সরকার ও কৃষক উভয় পক্ষের দুর্নীতি রোধে সহায়ক হবে।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা, মোঃ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চলতি আমন সংগ্রহ মৌসুমে ধান সংগ্রহ সুষ্ঠ ও স্বচ্ছতার সাথে সম্পাদনের লক্ষ্যে খাদ্য বিভাগ সকল কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। কৃষি বিভাগ হতে প্রাপ্ত তালিকা মোতাবেক লটারির মাধম্যে কৃষক নির্বাচন করে তাদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করা হবে। এক্ষেত্রে কোন দালাল , মধ্যস্বত্বভোগী বা কোন গোষ্ঠী শক্তি প্রদর্শন কওে হস্তক্ষেপ করলে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রশাসনিক ও আইনী গ্রহণের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নির্দেশনা প্রদান করেছেন। এছাড়া ময়মনসিংহ সদর উপজেলায় এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত সকলকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে এবং ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা ও অবহিতকরণের কার্যক্রম নেয়া হয়েছে। আশা করা যায় ডিজিটাল এ পদ্ধতিতে কোন রকম ঝামেলা ছাড়াই চলতি মৌসুমে ধান সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।¬¬¬¬¬ এ বছর চলতি আমন /২০১৯-২০২০ মৌসুমে ময়মনসিংহ জেলায় ২৭,৩২৩ (মে:টন) ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায়-২১০০(মে:টন),মুক্তাগাছায়-২১৬০(মে:টন),ফুলবাড়িয়ায়-২১০৫(মে:টন),ত্রিশালে-১৯১৭(মে:টন),ভালুকায়-১৯৯১(মে:টন),গফরগাও-২৩১২(মে:টন),নান্দাইলে-২২৮৯৯(মে:টন),ঈশ্বরগঞ্জে-১৯৫৩(মে:টন),গৌরীপরে-২১৩৫(মে:টন),ফুলপুরে-২১৭৬(মে:টন),তারাকান্দায়-২২৫৮(মে:টন),হালুয়াঘাটে-২৫১২(মে:টন) এবং ধোবাউড়ায়-১৪১৫(মে:টন)।
সারা দেশে এখন আগাম জাতের আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে। কৃষকের মাঠে-উঠানে সোনালি ধানের ছড়াছড়ি। আগামী এক মাসের মধ্যেই পুরোদমে শুরু হবে আমন ধান কাটার উৎসব। দেশে উৎপাদিত চালের শতকরা ৩৯ ভাগ পাওয়া যায় আমন মৌসুমে। আমন ধান চাষের সুবিধা হলো বোরো ধানের মতো এই ধান উৎপাদনে তেমন সেচ ও সারের প্রয়োজন হয় না। আমন ধানের উৎপাদন খরচ কম। আবহাওয়া অনুক‚লে থাকার কারণে এ বছরও আমনের বাম্পার ফলন হবে বলে আশা করছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা। জানা যায়, কৃষি শুমারি অনুযায়ী দেশে ১ কোটি ৪৫ লাখ কৃষকের কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড রয়েছে। সরকার ২ কোটি ৩০ লাখ কৃষকের ডাটাবেজ তৈরি করেছে। এর মধ্যে এক কোটি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক। এবার আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৮ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর। চাষাবাদ হয়েছে ৫৯ লাখ হেক্টর জমিতে। এ পরিমাণ জমি থেকে ১ কোটি ৫৩ লাখ টন চাল বা ২ কোটি ৫ লাখ টন ধান উৎপন্ন হতে পারে। গত বছর আমন উৎপাদিত হয় ১ কোটি ৪০ লাখ টন। কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, এ বছর প্রতিকেজি আমন ধানের উৎপাদন খরচ পড়েছে ২১ টাকা ৫৫ পয়সা। গত ৩১ অক্টোবর খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত সরকারের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে, আসন্ন আমন মৌসুমে ১০ লাখ টন ধান ও চাল সংগ্রহ করবে সরকার। এর মধ্যে ছয় লাখ টন ধান সংগ্রহ করা হবে প্রান্তিক কৃষকের কাছ থেকে, প্রতিকেজি ২৬ টাকা দামে। এ ছাড়া সাড়ে তিন লাখ টন সেদ্ধ চাল ও ৫০ হাজার টন আতপ চাল সংগ্রহ করা হবে চুক্তিবদ্ধ মিলারদের নিকট থেকে। প্রতিকেজি সেদ্ধ চাল ৩৬ টাকা এবং আতপ চালের দাম ৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। আগামী ২০ নভেম্বর থেকে ধান কেনা শুরু হবে। আর চাল কেনা শুরু হবে ১ ডিসেম্বর থেকে। এ কার্যক্রম চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১০ নভেম্বরের মধ্যে কৃষকদের তালিকা ইউনিয়ন পরিষদে জমা দিতে হবে, তারপর যাচাই-বাছাই করে তা চ‚ড়ান্ত করা হবে। যদি কৃষকের সংখ্যা বেড়ে যায়, তখন লটারির মাধ্যমে কৃষকের তালিকা তৈরি করা হবে। লটারির মাধ্যমে বাদ পড়া কৃষকরা বোরো মৌসুমে অগ্রাধিকার পাবেন। এর আগে ইউনিয়ন পর্যায়ে যারা এই ধানচাল সংগ্রহ করা নিয়ে দুর্নীতি করেছে, তাদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে এবং কঠোর মনিটরিং করা হচ্ছে বলে জানা যায়।
জানা গেছে, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তালিকা যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত কৃষক হলে তার নিবন্ধন করে নেবেন। সংগ্রহ অভিযান শুরু হলে নিবন্ধিত কৃষক অ্যাপসে প্রবেশ করে ধানের নাম, জমির পরিমাণ, কী পরিমাণ ধান বিক্রি করতে চান তা জানিয়ে আবেদন করবেন। এসব আবেদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বাধীন ধান-চাল সংগ্রহ সংক্রান্ত উপজেলা কমিটির কাছে যাবে। সংগ্রহের টার্গেট, আবেদনকারীর সংখ্যা ও ধানের পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে তালিকা চ‚ড়ান্ত করা হবে। প্রয়োজনে লটারির মাধ্যমে কৃষক মনোনীত করা হবে। মনোনীত কৃষকদের এসএমএসের মাধ্যমে কবে, কোথায়, কী পরিমাণ ধান দিতে হবে তা জানিয়ে দেয়া হবে। এই এসএমএস বা প্রিন্ট কপি দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট খাদ্যগুদামে ধান ও গম সরবরাহ করতে পারবেন কৃষক। প্রয়োজনে এলাকায় সংশ্লিষ্ট কৃষকদের নাম উল্লেখ করে মাইকিং করা হবে। উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এ সংক্রান্ত তথ্য ব্যাংকে পাঠালে ব্যাংক সংশ্লিষ্ট কৃষকের অ্যাকাউন্ডে প্রয়োজনীয় অর্থ প্রদান করবে। একই প্রক্রিয়ায় চাল কেনা হবে সংশ্লিষ্ট এলাকার চালকল মালিকদের কাছ থেকেও। তথ্য মতে, ১৩ টি উপজেলার কৃষি অফিসে প্রকৃত কৃষকদের তালিকা রয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রকৃত কৃষকদের তালিকা ধান/গম রোপণের প্রথম ১৫ (পনের) দিনের মধ্যে অনলাইনের মাধ্যমে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে তালিকা জমা দেবেন। এরপর ১০ দিন পর্যন্ত এই তালিকা উন্মুক্ত ও সংশোধনের সুযোগ থাকবে। সংশোধনের পর পুনরায় তালিকা অনলাইনে চ‚ড়ান্তভাবে প্রকাশ করবেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার। কৃষকের সংখ্যা বেশি হলে সফট্ওয়্যারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উপজেলা নির্বাহী অফিসার লটারি করবেন। লটারি বিজয়ী চ‚ড়ান্ত কৃষকদের তালিকা (যারা ধান/গম বিক্রি করতে পারবেন) প্রকাশ করবেন এবং মোবাইলে কৃষকদের কাছে এসএমএস যাবে। গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রকৃত কৃষকদের তালিকা থেকে ধান/গম ক্রয় করবেন এবং ধান/গম ক্রয় সম্পন্ন হলে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অনলাইনে পুনরায় এন্ট্রি দিয়ে সাবমিট করবেন। যেসব কৃষক ধান/গম বিক্রি করতে পেরেছেন তাদের নামের তালিকা চ‚ড়ান্তভাবে অনলাইনে প্রকাশ করবেন। সবাই জানতে পারবেন কোনো কৃষক কী পরিমাণে ধান বিক্রি করেছেন। কোনো কৃষক জমির পরিমাণের তুলনায় বেশি ধান বিক্রি করলে তার বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আদায়ের জন্য দুর্নীতির মামলা করা হবে। অর্থাৎ যদি কেউ প্রতারণার মাধ্যমে ধান বিক্রি করে, সেটা সহজেই এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জানা যাবে এবং ব্যবস্থা নেয়া যাবে।

পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

আপনার মতামত কমেন্টস করুন