একুশ আমার গর্ব,একুশ আমার অহংকার-একুশেতে গাথা স্বাধীনতার দ্বার

0
144

২০ ফেব্রুয়ারি –সারাদিন পুরো গ্রাম ঘুরে বেড়াতাম ।ফুল খোজতে প্রতিটি বাড়ির অনাচে কানাচে ঝুপঝাড় থেকে শুরু করে পুকুরপাড় কোথাও বাদ দেই নি ।রিনি আপাদের বাড়ির ফুলগুলো বেশি ভালো ছিল ,সন্ধার জন্য অধির আগ্রহে অপেক্ষা করতাম ।অতপর সন্ধাটা হলেই বন্ধরা বের হয়ে পড়তাম ফুল চুরির কাজে।রাত পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে ভালো ফুল সংগ্রহ করতাম।এরপর স্কুল মাঠে এসে সবাই মিলে ফুলের তোরা বানিয়ে ঘরের চালের উপর তোরাগুলো বিছিয়ে রেখে একটু ঘুমাতাম।ভোরে মোরগ ডাকার সাথে সাথেই ঘুম থেকে ওঠে এনামুল,কাওসারকে জাগিয়ে শহিদ মিনারের দিকে রওনা হতাম।বাড়ি থেকে কাছেই স্কুল মাঠ সেখানে বন্ধুরা মিলে কলার গাছ দিয়ে বানানো শহিদ মিনারের সামনে সবাই একত্র হতাম।ফুল দিতাম ,এ যেন একটি উৎসব ।আমার বাবার কন্ঠে একুশের গান ‘সালাম সালাম হাজার সালাম সকল শহিদ স্মরনে’ শুনতাম খেয়াল করতাম বাবার চোখে পানি।ভাবতাম আমরা এক রকম আনন্দে ২১ শে ফেব্রুয়ারী উৎসব পালন করছি অথচ বাবা কাদছে?
বাবাকে প্রশ্ন করাতে জানতে পারি, ১৯৪৭ সাল, দ্বিজাতি তত্বের ভিত্তিতে ভাগ হয় ব্রিটিশ ভারত।গঠিত হয় ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট ।অধিক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে গঠিত হওয়া পাকিস্তানে সংখ্যায় বেশি বাঙ্গালী যাদের মাতৃভাষা বাংলা। বিভিন্ন সভা সেমিনারে শোনা যাচ্ছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নাকি উর্দু হবে।অথচ পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ হল বাংলাভাষী ।স্বাভাবিক যুক্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলাই হওয়ার কথা।কিন্তু কথায় আছে জুর যার মুল্লুক তার।পাকিস্তান সরকার কতৃক বিভিন্ন সভা সেমিনারে উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বক্তব্যের প্রেক্ষিতে তৎকালিন ইসলামিক সাংস্কৃতিক সংগঠন তমদ্দুন মজলিশ প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন।
পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালে ২ মার্চ ফজলুল হক হলে কামরুদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে তমুদ্দিন মজলিস ও মুসলিম ছাত্রসমাজ এক যৌথসভা অনুষ্ঠিত হয়। ঐদিনই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ সম্প্রসারণ করে প্রথম সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়।[
১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চ পূর্ব পাকিস্তান সফরে এসে রেসকোর্স ময়দানে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এক সমাবেশে স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন যে ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা’। সেই সমাবেশেই উপস্থিত অনেকেই সাথে সাথে প্রতিবাদ করেন। কিন্তু তাতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। একটু থেমে তিনি তাঁর রাজনৈতিক বক্তৃতা ঠিকই চালিয়ে যান উর্দুভাষিক পাকিস্তান রাষ্ট্রের পক্ষে এবং সব রকম প্রগতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক চেতনার বিপক্ষে।
পরবর্তীতে পূর্ব-বঙ্গের অধিবাসী হওয়া সত্ত্বেও ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকায় সফরে এসে খাজা নাজিমুদ্দিন পল্টনে এক সমাবেশে জিন্নাহ’র কথাই পুনরাবৃত্তি করেন। সেসময়ও একইভাবে জোরালো প্রতিবাদে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান ওঠে।আর এরপর থেকেই শুরু হয় ভাষার প্রশ্নে জুড়ালো আন্দোলন সংগ্রাম।
খাজা নাজিমুদ্দিনের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে পরদিন থেকে পূর্ব-পাকিস্তানে শুরু হয় স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মঘট ও বিক্ষোভ মিছিল। যাতে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
ভাসানীর নেতৃত্বে হয় সম্মেলন, অংশ নেন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক, সংস্কৃতিকর্মী এবং পেশাজীবী সম্প্রদায়ের মানুষজন। ২১শে ফেব্রুয়ারি সাধারণ ধর্মঘট ঘোষণা করা হয়েছিল। ধর্মঘট প্রতিহত করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও তার আশপাশের এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছিলো। যা লঙ্ঘনেই জন্ম নেয় আমাদের শহীদ দিবস।পুলিশের গুলিতে শহীদ হন সালাম,বরকত,রফিক,জব্বারসহ আরো অনেকে।

এই আমাদের একুশ,এই আমাদের ভাষার ইতিহাস। আসলে একুশ কখনো পুরনো হয়না ,একুশ কখনো বৃদ্ধ হয়না,একুশ সবসময়ই টগবগে যুবক,একুশ একবার নয় শতবার শুনলেও মনে হয় নতুন একুশ শুনছি ।একুশ দুরন্তপনা শিখায়,একুশ শিখায় হার না মানা গল্প,একুশ শিখায় রক্তে রঞ্জিত ইতিহাস,একুশ শিখায় স্বাধীনতা,একুশ শিখায় নিজের শ্রেষ্ঠ সম্পদ ভাষাকে জিবন দিয়ে আকড়ে ধরা।একুশের এই শিক্ষা থেকেই বাঙ্গালী বুঝতে পারে পাকিস্তান আর বাংলা বা বাঙ্গালী এক হতে পারে না।যারা আজ মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চায় তারা পরশু জিবন কেড়ে নিতেও দ্বিধা করবে না।সুতরাং অবশ্যই বলা যায় একুশেই বাঙ্গালীর স্বাধীনতার বীজ বপন হয়েছিল।সুতরাং আমি বলব ‘একুশ আমার গর্ব একুশ আমার অহংকার-একুশেতে গাথা স্বাধীনতার দ্বার‘।
আজাহারুল ইসলাম আজাহার
সম্পাদক – পল্লী সংবাদ।

পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

আপনার মতামত কমেন্টস করুন